বিচার ব্যবস্থার প্রতি অনাস্থাই গণপিটুনির মত ঘটনা ঘটায়
- সাবিয়া সিদ্দিকী
১৯ জুলাই ছিলো তার জন্মদিন। পরিবারের সবাই মিলে আনন্দ করার কথা ছিলো। আনন্দ আর হলো না, নেমে এলো বিষাদের ছায়া। পরিবারের সবার ছোট সন্তান হওয়ায় সে বাবা মায়ের খুব আদরের সন্তান ছিল। ‘‘আদরের এই সন্তানের লাশ এমনভাবে থ্যঁাতলানো ছিল যে আমার মাকে ভাইয়ের মুখটি শেষবারের মত দেখাতে পারিনি। কারণ আমার মা সহ্য করতে পারবেন না!’’
কথাগুলো বলছিলেন আমিনবাজারে ডাকাত সন্দেহে গণপিটুনিতে নিহত ছয়জনের একজন তেজগাঁও কলেজের ব্যবস্থাপনা বিভাগের প্রথম বর্ষের ছাত্র টিপু সুলতানের বড় ভাই শেখ ফরিদ।
তিনি বলেন, ‘আমার ভাইটির স্বাস্থ্য হ্যাংলা পাতলা বলে এই বয়সেও মা মুখে তুলে খাইয়ে দিতেন। সে কি করে ডাকাতির মত ঘটনার সাথে জড়িত হবে! প্রিয় সন্তানের মৃত্যুতে শোকে মা শয্যাশায়ী, বাবা মুজিব বাহিনীর গেরিলা কমান্ডার মুক্তিযোদ্ধা আব্দুর রশিদ পাগলপ্রায়, ক্ষণে ক্ষণে প্রলাপ বকেন। শেখ ফরিদ এই হত্যাকান্ডের বিচার নিয়ে শঙ্কিত। তিনি বলেন, ‘অপরাধীদের কাছ থেকে পুলিস টাকা খেয়ে ঘটনাকে ভিন্নভাবে সাজাচ্ছে।’
সাম্প্রতিক সময়ে গণপিটুনিতে হত্যার ঘটনা আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে। এধরণের ঘটনায় কোনও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি এ পর্যন্ত নজরে আসেনি। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন বিচার ব্যাবস্থার প্রতি সাধারণ মানুষের অনাস্থাই প্রতিনিয়ত এই ঘটনাগুলোর জন্ম দিচ্ছে।
মানবাধিকার সংস্থা অধিকারের তথ্য অনুযায়ী ২০১০ সালের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত দেশের মোট ১৩০টি স্থানে ১৭৪ জনকে গণপিটুনিতে হত্যা করা হয় এবং ২০১১ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ২৯ জুলাই পর্যন্ত ৯৫ জনকে ডাকাতি, চুরিসহ বিভিন্ন অভিযোগে জনগণের রোষানলে পড়ে প্রাণ দিতে হয়।
এছাড়াও ২০০১ থেকে ২০০৩ সাল পর্যন্ত ঢাকা ও এর আশেপাশের এলাকায় বিভিন্ন ঘটনায় প্রায় ১৫০ জন গণপিটুনিতে নিহত হন এবং ২০০৬ সালে প্রতি মাসে গড়ে প্রায় ৬ জন লোক ক্ষুব্ধ জনতার হাতে প্রাণ হারান।
দেশে ক্রমবর্ধমান গণপিটুনির মতো সহিংসতার ঘটনাগুলো বিবেচনায় এনে রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ নিয়ে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন বিশেষজ্ঞ মহল।
এ বিষয়ে মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক)-এর পরিচালক সুলতানা কামাল বলেন, ‘‘বিচার ব্যবস্থার প্রতি সাধারণ মানুষের অনাস্থাই এই ধরণের ঘটনাগুলোর জন্ম দিচ্ছে। রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক বা সামাজিক কোনো শক্তির সঙ্গে অপরাধীদের সংযোগ থাকার কারণে তারা নিজেদের আইনের উর্ধে বলে মনে করেন। এর ফলে অপরাধীরা পার পেয়ে যায়। যতদিন পর্যন্ত সমাজে ন্যায় বিচারের সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠিত না হবে ততদিন পর্যন্ত এই ঘটনাগুলো ঘটতেই থাকবে।’’
অতীতে চুরি-ডাকাতি-ছিনতাইয়ের মতো অভিযোগে গণপিটুনির শিকার হয়ে অনেকে নিহত হলেও ১৮ জুলাই ২০১১-য় আমিনবাজারে ডাকাত সন্দেহে গণপিটুনিতে ছয়জন ছাত্রের মৃত্যূর ঘটনা পুরো জাতির বিবেককে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছে।
আমিনবাজারের ছয় ছাত্রের মৃত্যূর ঘটনার কথা উলেখ করে র্যাবের একজন উর্দ্ধতন কর্মকর্তা বলেন, ‘‘আমিনবাজার একটি মাদকের আখড়া। মাদকের সঙ্গে সম্পৃক্ত ব্যক্তিবর্গের ওপর রাজনৈতিক ব্যক্তি ও আমলাদের প্রচ্ছন্ন ছায়ার কারণে প্রশাসন এদের বিরুদ্ধে কোন শক্তিশালী ব্যবস্থা নিতে পারে না।’’
ছয়জন ছাত্রের মৃত্যুর ঘটনার সঙ্গে মাদকের সংশ্লিষ্টতা রয়েছে বলে তিনি মনে করছেন।
অন্যদিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শান্তি ও সংঘর্ষ বিভাগের অধ্যাপক ডালিম চন্দ্র বর্মণ মনে করেন, ‘‘প্রশাসন ঠিকভাবে দায়িত্ব পালন না করার কারণে জনগণ নিজের হাতে আইন তুলে নিচ্ছে।’’
তিনি এ-ও মনে করেন যে, জনগণের মধ্যে আক্রমণাত্মক মনোভাবও তৈরি হয়েছে। যে কারণে এই ধরণের ঘটনাগুলো বেশি হচ্ছে। এজন্য তিনি বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থা আগের মতো না থাকা, সামাজিক নিরাপত্তাবোধের অভাবকেও দায়ী করেন। তিনি মনে করেন, এ সমস্যা মোকাবেলায় কালক্ষেপণ না করে এখনই শক্তভাবে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলা প্রয়োজন। তা না হলে দেশ এক সঙ্কটজনক অবস্থায় চলে যাবে।
আমিনবাজারে ছয়জন ছাত্রকে পিটিয়ে হত্যার ঘটনার পর নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জে গণপিটুনিতে সন্দেহভাজন ৬ জন ডাকান নিহত হন। কুমিলার দেবীদ্বারে আম চুরির অভিযোগে ১০ বছরের সোহেলকে প্রাণ দিতে হয়। পর পর ঘটে যাওয়া এই ঘটনাগুলো থেকে আঁচ করা যায় সাধারণ জনগণের মধ্যে আইন হাতে তুলে নেবার প্রবণতা দিন দিন বেড়েই চলেছে। বিচার বহির্ভূত এসব হত্যাকান্ড দেশকে এক সঙ্কটজনক পর্যায়ে নিয়ে যাচ্ছে।
দিন দিন সাধারণ মানুষের মধ্যে হত্যার মতো ঘটনা ঘটিয়ে ফেলার যে আক্রমণাত্মক মানসিকতা তৈরি হয়েছে এর কারণ হিসেবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মেহজাবিন হক মনে করেন, মানবিক গুণাবলীর উন্নততর বিকাশ না হওয়ার কারণে এই ঘটনাগুলোর পুনরাবৃত্তি ঘটছে। তিনি বলেন, ‘‘শিক্ষা ব্যবস্থায় জ্ঞানের দক্ষতা, হাতে কলমে শিক্ষা ও মনস্তাত্বিক জগতের পরিবর্তন- এই তিন ক্ষেত্রেই সমানভাবে পারদর্শিতার প্রয়োজন। অথচ শিক্ষাক্ষেত্রে জ্ঞানের দক্ষতা অর্থাৎ কেবল তথ্য দিয়ে মাথা ভারি করা হয়। হাতে কলমে শিক্ষা যেমন গাছ লাগানোর মতো মননধর্মী শিক্ষাগুলো খুব সামান্যই শেখানো হলেও প্রকৃত মানুষ হয়ে ওঠার প্রক্রিয়ায় মনস্তাস্তিক জগতের পরিবর্তনের দিকটায় একেবারেই নজর দেয়া হয় না। যে কারণে মানুষের মাঝে নৈতিকতার বিকাশ ঘটছে না। ব্যক্তিকেন্দ্রিক চিন্তা চেতনার কারণে ভাল মন্দের আবেগ অনুভূতিগুলোতে প্রভাব ফেলছে এবং এই আবেগ অনুভূতিগুলোর ব্যাপারে সামাজিক অনুমোদিত পন্থায় শিক্ষা দেওয়া হচ্ছে না বলেই দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা আর নৈতিকতার অবক্ষয় মানুষের মনস্তাস্তিক চেতনাকে গণপিটুনির মতো ধ্বংসাত্মক কাজের সঙ্গে সম্পৃক্ত করছে।’’
তিনি মনে করেন, সমাজের ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে হলে মনস্তাস্তিক জগতের পরিবর্তন আনার ক্ষেত্রে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি পরিবারকেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে হবে।
শুধু কি আইন করেই এই সমস্যা সমাধান সম্ভব ? সমাজবিজ্ঞানী অধ্যাপক আতিকুর রহমানের মতে, একটি গণতান্ত্রিক দেশে কেবল আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা প্রয়োজন। তিনি বলেন, রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা ও সর্বক্ষেত্রে দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনার ফলে রাষ্ট্রের বিচার ব্যবস্থা, শিক্ষা, শাসন ব্যবস্থা প্রতিটি ক্ষেত্র থেকেই জনগণের আস্থা উঠে গেছে। এই সমস্যা মোকাবেলা রাজনৈতিকভাবেই করা প্রয়োজন বলে তিনি মত দেন। তিনি বলেন, ‘‘এদেশের গণতন্ত্র কেবলই নির্বাচনমুখি, যে কারণে জনপ্রতিনিধি বা রাজনীতিবিদরা জনসাধারণের সুবিধা দেওয়ার যে অঙ্গীকার করেন নির্বাচন হওয়ার পর তা ভুলে যান এবং খোদ নির্বাচিত প্রতিনিধিরাই আইন নিজেদের হাতে তুলে নেন। তাই সাধারণ মানুষও রাজনৈতিক নেতাদের পথ অনুসরণ করেন এবং নিজেদের হাতে আইন তুলে নেন। যে কারণে বিচার বহির্ভূত হত্যাকান্ডগুলো ঘটে চলেছে।
মৃত্যু প্রতিটি মানুষের ক্ষেত্রেই একটি স্বাভাবিক ঘটনা। অস্বাভাবিক মৃত্যু আসলে কারই কাম্য নয়। অন্যায় করলে দেশে বিচার ব্যবস্থা রয়েছে। শাস্তির বিধান করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। সাধারণ মানুষের নিজের হাতে আইন তুলে না নিয়ে রাষ্ট্রের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়াটা যেমন জরুরি তেমনি প্রশাসনিক গাফিলতির কারণে জনগণকে যেন কোনো ভোগান্তির শিকার না হতে হয় সেদিকে প্রশাসনের সুনজর দিতে হবে। মানুষের মধ্যে নিরাপত্তাবোধ ফিরিয়ে আনতে পারলেই জনগণের রোষানলে পড়ে আর কোন ব্যক্তিকে প্রাণ দিতে হবে না।








