পানির যুদ্ধে হেরে যাচ্ছে দরিদ্ররা নীরবে নিভৃতে সবচেয়ে বড় মানবাধিকার লঙ্ঘন
- সালাহউদ্দীন বাবলু
সাতক্ষীরার বুড়িগোয়ালিনীর আছিয়া বেগম (৫০) চার প্রজন্মের ভিটেমাটি আর ঐতিহ্যবাহী জীবন-জীবিকা ছেড়ে এখন রাজধানী ঢাকার বস্তিবাসী। স্বামী জোবেদ আলীর হাত ধরে দু’মাস যাবত ঢাকায় এসে এক হোটেলে রান্নার কাজ পেয়েছে সে। থাকেন কারওয়ানবাজারের পাশে রেলের বস্তিতে। স্বামী ফেরি করে মাছ বেচেন। দু’জনের আয়ে সংসার চললেও চাকচিক্যময় এ নগর জীবনে তারা কেউই সুখি নয়।
কর্মজীবী তিন প্রাপ্তবয়স্ক সন্তানও তাদের সাথেই এলাকা ছেড়ে শ্রমিকের কাজ নিয়েছে টঙ্গী এবং আশুলিয়ার শিল্প এলাকায়। ফেলে আসা সুখ-দুঃখে ভরা গ্রামীণ জীবনের জন্য সারাক্ষণই মন কাঁদে আছিয়া আর জোবেদ আলীর। প্রতিরাতেই লোনা অশ্রুতে বুক ভাসিয়ে তারা ঘুমাতে যায়। চোখের পানির মতো লোনা পানিই হয়েছে তাদের জীবনের কাল। দুঃখের সাগরে ভাসা চোখের পানি আর লোনা পানি আজ তাদের জীবনে একাকার হয়ে গেছে।
আছিয়া-জোবেদের মতো শত শত দরিদ্র মানুষ এখন প্রতিদিনই বাংলাদেশের উপকূলীয় জেলাগুলোর ঐতিহ্যবাহী জনপদ ছেড়ে ভিন্ন ঠিকানায় পাড়ি জমাচ্ছেন। লোনা পানির আগ্রাসনে এলাকা ছাড়তে বাধ্য হচ্ছেন তারা। লোনা পানির দাপটে জীবন-জীবিকা দুই-ই হারিয়ে তারা এখন অন্ধকার চোখে শহুরে বস্তির মানবেতর জীবনে পা রাখছেন। কারণ উত্তরের মঙ্গা এখন ভর করছে উপকূলীয় দক্ষিণ-পশ্চিমে। বাংলাদেশের সাম্প্রতিক আদমশুমারি প্রতিবেদনেও উল্লেখ করা হয়েছে, সারাদেশে যেখানে জনসংখ্যা বাড়ছে, সেখানে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় জেলাগুলোর জনসংখ্যা হ্রাস পাচ্ছে। মিঠা পানির সঙ্কটে জীবিকা হারিয়ে দরিদ্র মানুষ বেঁচে থাকার আশায় বাপ-দাদার ঐতিহ্যবাহী ভিটেমাটি ছাড়ছে।
যে পানির অপর নাম জীবন, সেই পানিই এখন বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের প্রায় ৩ কোটি মানুষের জন্য মরণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তবে লোনা পানি আবার ধনিক গোষ্ঠীর কারো কারো জীবনের জন্য সমৃদ্ধি হিসেবেও বিবেচিত হচ্ছে। কিন্তু সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের কাছে হয়ে উঠেছে মরণের প্রতীক। পার্থক্যটা আসলে ধনী ও দরিদ্র শ্রেণীর ক্ষমতার। বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ৩ কোটি জনগোষ্ঠীর মাঝে এই ক্ষমতার পার্থক্য দিনদিনই বাড়ছে এবং ক্ষমতার এই লড়াইয়ে হেরে যাচ্ছে দরিদ্ররা। ফলে জীবনের অতি গুরুত্বপূর্ণ অধিকার- সুপেয় পানি থেকে বঞ্চিত হচ্ছে বিপুল সংখ্যক দরিদ্র জনগোষ্ঠী। পানির জন্য তাদের দিতে হচ্ছে চড়া মাশুল। দেশের এবং বিদেশের কিছু ধনিক গোষ্ঠীর রসনার কাছে বলি হচ্ছে তাদের জীবনের এই অন্যতম মানবাধিকার।
অথচ আজ থেকে ২০/২৫ বছর আগেও তাদের জীবন-জীবিকায় এমন অনিশ্চয়তা ও উদ্বেগ ছিল না। লবণ পানি আজ তাদের জীবনকে অধিকারহারা করে বিষিয়ে তুলেছে।
বুড়িগোয়ালিনীর কৃষক হাফিজুর রহমান জানান, গত দু’ দশকে এলাকায় শুধু ভূপৃষ্ঠের পানিই নয়, ভূগর্ভের পানিতে এমনকি মাটিতেও লবণাক্ততা বেড়ে গেছে বহু গুণ। সেই সাথে এসেছে আর্সেনিক দূষণ। আর এই লবণাক্ততা বৃদ্ধির জন্য প্রথমত এবং প্রধানত দায়ী চিংড়ি চাষ। দ্বিতীয়ত, উজানে ফারাক্কা বাঁধসহ ভারতের আরো কিছু বাঁধের কারণে নদ-নদীগুলোয় মিঠাপানি প্রবাহের অভাব এবং মাথাভাঙ্গা, ইছামতি, কপোতাক্ষের মতো ঐতিহ্যবাহী নদ-নদীগুলোর মৃত্যু। তৃতীয়ত, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সমুদ্র পৃষ্ঠের উচ্চতা ধীরে ধীরে বৃদ্ধি এবং সিডর-আইলার মতো ঘূর্ণিঝড়ের সংখ্যাও বৃদ্ধি।
জলবায়ু ও পানি বিশেষজ্ঞ প্রফেসর ড. আইনুন নিশাতও এর সাথে একমত পোষণ করে বলেন, বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের জনপদগুলোতে লবণাক্ততা সবচেয়ে বেশি বাড়ছে মূলত চিংড়ি ঘেরগুলোর কারণে। কিছু ধনিক গোষ্ঠী অতিরিক্ত মুনাফার আশায় উপকূলীয় অঞ্চলের কৃষিজমিতে কৃত্রিমভাবে লোনা পানি ঢুকিয়ে গত দু’তিন দশক যাবত চিংড়ি চাষ করায় পুরো এলাকাই বর্তমানে লবণের বিষে ভরে গেছে। কোনো পুকুর-ডোবাও এখন এর প্রভাব থেকে বাকী নেই। লবণ দ্রুত ঢুকে পড়ছে সর্বত্র। যার পরিণতিতে সংশিষ্ট এলাকার ভূগর্ভের পানিও এমন মাত্রাতিরিক্তভাবে লবণাক্ত হয়েছে যে, তা বর্তমানে আর ব্যবহারের ন্যূনতম উপযোগী নেই। ফলে এলাকায় ব্যাপকভাবে খাবার পানির সংকট দেখা দিয়েছে।
সাতক্ষীরা অঞ্চলে কর্মরত আহছানিয়া মিশনের পানি ও স্যানিটেশন বিশেষজ্ঞ প্রকৌশলী ইমাম মাহমুদ রিয়াদ জানান, মানুষ কোনো খাদ্য ছাড়া ৫০ দিন পর্যন্ত বাঁচতে পারে। কিন্তু পানি ছাড়া বাঁচতে পারে সর্বোচ্চ ৫ দিন। তাই জীবনে পানির অধিকার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
তিনি জানান, ১০/১৫ কিলোমিটার দূর থেকেও এখন বৃহত্তর খুলনার অনেক এলাকায় খাবার পানি আনতে হচ্ছে এবং ১০ লিটারের সমপরিমাণ এক কলসি পানির দাম পড়ছে ৩০ টাকা পর্যন্ত। দিনের অর্ধেক সময় পার হয়ে যাচ্ছে একেকটি পরিবারের খাবার পানি জোগাড় করতে। যার অসহায় শিকার সবচেয়ে বেশি হচ্ছে মহিলারাই। পানির কারণে ঘরে ঘরে নিত্য বিবাদ লেগেই থাকছে। যারা এতো সময় ও অর্থ ব্যয় করে পানি জোগাড় করতে পারছে না, তাদের হয় এলাকা ছাড়তে হচ্ছে নয়তো বাধ্য হয়ে লবণাক্ত পানি পান করে নানা রোগব্যাধিতে আক্রান্ত হতে হচ্ছে। এদেরই একজন, সাতক্ষীরার কালিগঞ্জের হাসিনা বানু জানান, ক্রমাগত লবণাক্ত পানি পান করে তার গ্রামের অধিকাংশ দরিদ্র মানুষই বর্তমানে গ্যাষ্ট্রিকের রোগী। সারাদিন বমি বমি ভাব থাকে। কাজে অনীহা। মাথা ঘোরে। লবণের মাত্রা বেড়ে যাওয়ায় শরীরের বিভিন্ন স্থানে বিষ-ব্যথাও বাড়ছে। পাশাপাশি পানিতে আর্সেনিক দূষণ বৃদ্ধিতে হাতে-পায়ে-শরীরে ঘা-পাঁচড়াও এমনভাবে বেড়েছে যে, কাজ করতে অসুবিধা হয়। এসব কারণে এলাকার মেয়েদের বিয়ে-শাদিও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
নলতার পানি সরবরাহকারী তারেক জানান, ১০/১২ বছর আগে পর্যন্ত ওই এলাকার মানুষ কূয়া কিংবা টিউবওয়েলের মাধ্যমে ভূগর্ভের পানি ব্যবহার করতে পারতো। কিন্তু সাম্প্রতিককালে এই এলাকায় চিংড়ির ঘের এতো বেড়েছে যে, এর প্রভাবে ভূগর্ভের পানিও মাত্রাতিরিক্ত লবণাক্ত হয়ে ব্যবহারের সম্পূর্ণ অনুপযোগী হয়ে গেছে।
শত বাধা দিয়েও প্রভাবশালীদের এই চিংড়ি চাষ থেকে বিরত রাখা যায়নি। প্রতিদিনই বাড়ছে তাদের রপ্তানিনির্ভর চিংড়িচাষ। যে চিংড়ি আসলে দরিদ্র মানুষের চোখের পানিতেই চাষ হচ্ছে। ফলে এলাকার ঐতিহ্যবাহী কৃষি পেশাও বর্তমানে বিলুপ্তির পথে। সনাতনী জীবিকা হারিয়ে অনেকেই শহরমুখি হচ্ছে।যারা এখনো এলাকা ছাড়তে পারেনি, তারা ৬/৭ কিলোমিটার দূর থেকে ব্যয়বহুল পাইপ ওয়াটারের মাধ্যমে পানি এনে ব্যবহার করছে। এতে তাদের খরচ একদিকে বেড়ে গেছে, অপরদিকে পর্যাপ্ত সুপেয় পানি প্রাপ্তিও কমে গেছে। সংকটের কারণে এলাকায় পানি রেশনিং করতে হচ্ছে। অথচ ১০ বছর আগেও এই এলাকার দরিদ্র মানুষেরা কখনো ভাবেনি যে, শহরের মতো তাদেরও কোনোদিন চড়ামূল্যে পানি কিনে খেতে হবে এবং পাইপ ওয়াটারের ওপর নির্ভরশীল হতে হবে। আর এতে সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছে দরিদ্র জনগোষ্ঠী।
চিংড়ি চাষ বেড়ে যাওয়ায় শুধু মানুষই নয়, এলাকায় গরু-ছাগল, হাঁস-মুরগি ও বৃক্ষরাজির সংখ্যাও হ্রাস পেয়েছে উলেখ করে তিনি জানান, লবণের দাপটে এলাকায় কিছুই টিকতে পারছে না। জীববৈচিত্র্য দ্রুত হ্রাস পাচ্ছে।








