নিজের দাবি-দাওয়া জানানোর অধিকার নেই গার্মেন্ট শ্রমিকদের তিন দশকেও গার্মেন্ট শিল্পে চালু হয়নি ট্রেড ইউনিয়ন

- মনজুরুল ইসলাম বাবু


বাংলাদেশের অর্থনীতিতে গার্মেন্ট শিল্পের ভূমিকা খুবই প্রভাবশালী। শুধু বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন নয়, এর মাধ্যমে লক্ষ লক্ষ মানুষের কর্মসংস্থানেরও সৃষ্টি হয়েছে। ৮০’র দশক থেকে বাংলাদেশে বিকাশমান পোশাক শিল্প খাতে বর্তমানে প্রায় ৩৫ লাখেরও বেশি শ্রমিক কাজ করেন। কিন্তু এই বিপুল সংখ্যক শ্রমিকের ট্রেড ইউনিয়ন করার সুযোগ নেই। গার্মেন্ট শ্রমিকেরা দীর্ঘদিন ধরে ট্রেড ইউনিয়ন চালুর দাবি জানিয়ে এলেও মালিকেরা এর বিরোধিতা করছিলো। এর ফলে একদিকে যেমন শ্রমিকদের মানবাধিকার লঙ্ঘিত হচ্ছে, তেমনি মাঝে মাঝেই শ্রমিকদের ক্ষোভ-বিক্ষোভে অস্থির-উত্তাল হয়ে উঠছে গার্মেন্ট শিল্প অঙ্গন।

১৯৪৮ সালে জাতিসংঘের সার্বজনীন মানবাধিকার ঘোষণায় শ্রমিকদের সংগঠন বা ট্রেড ইউনিয়ন করার অধিকার দেয়া হয়েছে। এছাড়া বাংলাদেশ আমর্ত্মজাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও) এর সদস্যভুক্ত দেশ। শ্রমিকদের মৌলিক অধিকার সংরক্ষণের জন্য আইএলও এ পর্যমত্ম ১৮৩টি কনভেনশন প্রণয়ন করেছে। আটটি কোর কনভেনশনসহ ৩৩টি কনভেনশনে বাংলাদেশ অনুসমর্থন দিয়েছে। এর মধ্যে ৮৭ এবং ৯৮ নম্বর কনভেনশন অনুযায়ী শ্রমিকদের যৌথ দরকষাকষি এবং ট্রেড ইউনিয়ন করার অধিকার প্রদান করা হয়েছে। আমর্ত্মজাতিকভাবে স্বীকৃত এসব বাধ্যবাধকতা সত্ত্বেও বছরের পর বছর বাংলাদেশের গার্মেন্ট শিল্পে ট্রেড ইউনিয়ন কার্যকর করা হয়নি।

গার্মেন্টস শ্রমিক ঐক্য ফোরামের সভাপতি মোশরেফা মিশু বলেন, গার্মেন্ট কারখানায় ট্রেড ইউনিয়ন করায় মালিকেরা নানাভাবে বাধা দিয়ে আসছে। গার্মেন্ট শ্রমিকদের ট্রেড ইউনিয়ন করার সুযোগ থাকলে তারা প্রাতিষ্ঠানিকভাবে তাদের দাবি দাওয়া হাজির করতে পারতো। তাহলে ভাঙচুর বা বিশৃঙ্খলার যে অভিযোগ করা হয়, সেটি যেমন এড়ানো যেতো, তেমনি নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলনের পথও তৈরি হতো।

মিরপুরসহ রাজধানীর বেশ কয়েকটি এলাকার গার্মেন্ট শ্রমিকদের সাথে আলাপ করে জানা গেছে, দাবি-দাওয়া বা সুবিধা-অসুবিধা নিয়ে কথা বলার মতো তাদের নিজস্ব কোনো সংগঠন নেই। তাই মালিকপক্ষের অনেক অন্যায্য সিদ্ধামত্মও তাদের মেনে নিতে হয়। কেউ যদি প্রতিবাদ করে তাহলে তাকে চাকরি থেকে বরখাসত্মসহ নানা ধরনের অন্যায় আচরণের শিকার হতে হয়। শ্রমিকেরা জানান, স্থানীয় সন্ত্রাসী ও ঝুট ব্যবসায়ীরা মালিকদের পোষা গুন্ডা হিসেবে কাজ করে। দাবি-দাওয়া নিয়ে আন্দোলন করলে এই সন্ত্রাসীরা তাদের ভয়-ভীতি প্রদর্শন এমনকি মারধোরও করে থাকে।

মানবাধিকার সংগঠন অধিকারের সেক্রেটারি এবং বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী আদিলুর রহমান খান বলেন, গার্মেন্ট শ্রমিকেরা নানাভাবে মানবাধিকার লঙ্ঘনের শিকার। ট্রেড ইউনিয়ন থাকলে তারা তাদের এই অধিকারগুলো নিয়ে মালিকপক্ষের সথে কথা বলার সুযোগ পেতো। কিন্তু এখন তাদের ‘কথা বলার’ সেই সুযোগটুকুও নেই।

গার্মেন্ট শিল্পে ট্রেড ইউনিয়ন চালু নিয়ে পোশাক শিল্প ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন বিজেএমইএ কার্যালয়ে যোগাযোগ করা হলে সেখানকার কর্মকর্তারা কোনো কিছু বলতে অপারগতা প্রকাশ করেন। এ বিষয়ে বিজেএমইএ- এর নেতৃবৃন্দের সাথে কথা বলার চেষ্টা করা হলেও তাদেরকে পাওয়া সম্ভব হয়নি।

 

ট্রেড ইউনিয়ন নিয়ে সরকারের টালবাহানা

শ্রম আইন অনুযায়ী গার্মেন্ট কারখানায় ট্রেড ইউনিয়ন চালুর জন্য গত বছর অক্টোবরের শেষদিকে সরকার একটা কমিটি গঠন করেছিল। সে সময় শ্রমমন্ত্রী খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেছিলেন, ‘দেশে ৩৫০০ গার্মেন্ট কারখানার মধ্যে মাত্র ১৭৫টিতে ‘পার্টিসিপেটরি কমিটি’ রয়েছে। কিন্তু এতেও যথাযথ প্রক্রিয়ায় শ্রমিক প্রতিনিধি অমর্ত্মভুক্ত করা হচ্ছে না। তাই শ্রমিকদের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করতে ট্রেড ইউনিয়ন করতে দেয়া উচিত।’

আরো বলা হয়েছিল, কমিটি দ্রততম সময়ের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দেবে এবং প্রতিটি গার্মেন্ট কারখানায় একটি করে হলেও ট্রেড ইউনিয়ন চালু করা হবে। কিন্তু প্রায় নয় মাস পার হয়ে গেলেও কমিটির প্রতিবেদন জমা দেয়ার বা ট্রেড ইউনিয়ন চালুর বিষয়ে কোনো অগ্রগতির কথা জানা যায়নি। এই বিষয়ে শ্রম মন্ত্রণালয়ের একাধিক কর্মকর্তার সাথে যোগাযোগ করা হলেও তারা কিছু জানাতে পারেননি।

এ প্রসঙ্গে গার্মেন্ট শ্রমিক নেত্রী মোশরেফা মিশু বলেন, গার্মেন্ট কারখানায় ট্রেড ইউনিয়ন চালু করতে সরকারের সত্যিকার অর্থে কোনো উদ্যোগ বা ইচ্ছা নেই। সরকার খোলাখুলিভাবে মালিকদের পক্ষে এবং শ্রমিকদের স্বার্থের বিরম্নদ্ধে কাজ করছে।

শ্রম আইন-২০০৬: ট্রেড ইউনিয়ন নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা

২০০৬ সালের ১১ অক্টোবর তৎকালীন চারদলীয় জোট সরকার ‘বাংলাদেশ শ্রম আইন ২০০৬’ প্রণয়ন করে। পরবর্তীকালে সেনা সমর্থিত তত্তবাবধায়ক সরকারের আমলে এর কিছু সংশোধন করা হয়। উভয়পক্ষেত্রেই শ্রমিক কর্মচারীদের ট্রেড ইউনিয়ন অধিকারকে সংকুচিত করা হয়েছে। এতে এমন সব বিধান রাখা হয়েছে যা আইএলও কনভেনশনের পরিপন্থী এবং একইসাথে নিবর্তনমূলকও।

২০০৬ সালের আইনে বলা হয়েছে, কোনো প্রতিষ্ঠানে শ্রমিক ইউনিয়ন গঠন করতে হলে প্রথমে মালিককে তার তালিকা দিতে হবে। এই ধারাটি মালিকের জন্য একটি মোক্ষম হাতিয়ার। নামের তালিকা মালিকের হাতে থাকলে নানা কৌশলে সেসব শ্রমিককে ছাঁটাই করা যায়। এরকম পরিস্থিতিতে চাকরি হারানোর ঝুঁকি নিয়ে শ্রমিকদের পক্ষে ট্রেড ইউনিয়ন করাটা দারম্নণ কঠিন বিষয়।

এ প্রসঙ্গে ট্রেড ইউনিয়ন ফেডারেশনের আহবায়ক শাহ আতিউল ইসলাম বলেন, ‘বাংলাদেশ শ্রম আইন ২০০৬’ একটি শ্রমিক স্বার্থবিরোধী আইন। রাষ্ট্র অগণতান্ত্রিক আইন করে শ্রমিকদের ট্রেড ইউনিয়ন অধিকারকে নিয়ন্ত্রণ এবং ক্ষুণ্ণ করছে। তিনি এটি বাতিল করে একটি গণতান্ত্রিক শ্রম আইন প্রণয়নের দাবি জানান।

Leave a Reply